বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও উত্তরণের উপায়

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও উত্তরণের উপায়

১. ভূমিকা ও বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির পটভূমি (Introduction & Global Context)

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তা ও তীব্র ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ব বাণিজ্য যে উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিশ্বায়নের ওপর ভর করে প্রসারিত হয়েছিল, তা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF)  ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ২০২৬’  অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতি এখন সম্পূর্ণভাবে “যুদ্ধের ছায়ায়” পরিচালিত হচ্ছে। পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.১ শতাংশে নেমে আসবে, যা প্রাক-মহামারী গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ভেঙে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল ও প্রয়োজনীয় পণ্যের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি শিল্প কাঁচামালের উৎপাদন এবং বৈশ্বিক পরিবহন ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই বৈশ্বিক সংকটের তরঙ্গপ্রবাহ থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। বিশ্বব্যাংকের  ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট ২০২৬’  অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে পণ্য আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে মন্দা এবং বৈশ্বিক আর্থিক চরম অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের এই যৌথ অর্থনৈতিক ধাক্কা দেশের সার্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশকে অত্যন্ত কঠিন পরিপ্রক্ষিতে ঠেলে দিয়েছে।

২. বাংলাদেশের উদ্যোক্তা খাত (CMSME) ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Overview & Economic Significance of Entrepreneurs)

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (CMSME) খাত দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি বা “ব্যাকবোন” হিসেবে পরিচিত। দেশের সামগ্রিক শিল্প পরিকাঠামো ও কর্মসংস্থানে এ খাতের ঐতিহাসিক ও পরিসংখ্যানগত ভূমিকা অত্যন্ত গভীর:

  • শিল্প কাঠামো ও কর্মসংস্থান:  বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭৯ লাখ (7.9 million) SME রয়েছে, যার মধ্যে ৯৩.৬% ক্ষুদ্র এবং ৬.৪% মাঝারি শ্রেণির। এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের মোট শিল্প কারখানার ৯০% গঠন করে এবং শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৮০% যোগান দেয়। দেশে প্রায় ২.৪৫ কোটি (24.5 million) মানুষ সরাসরি এ খাতে নিয়োজিত রয়েছে।
  • উৎপাদন ও জিডিপিতে অবদান:  দেশের উৎপাদনশীল খাতের ভ্যালু এডিশনে (Value Addition) এ খাত ৪৫% অবদান রাখলেও, মোট জিডিপিতে (GDP) এর অবদান মাত্র ২৫%। প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এই হার বেশ কম—ইন্দোনেশিয়ায় জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৫৯%, শ্রীলঙ্কায় ৫২%, কম্বোডিয়ায় ৫৮%, ভিয়েতনামে ৪৫% এবং পাকিস্তানে ৪০%। জাতীয় ‘এসএমই নীতি ২০১৯’ অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৩২%-এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও সামাজিক টেকসইতার ক্ষেত্রে এ খাতের গুরুত্ব নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • রপ্তানি আয় বৃদ্ধি:  দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৫% থেকে ৮০% অর্জনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান রয়েছে। তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাতের ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে এসএমইগুলো মূল ভূমিকা পালন করে। এছাড়া চামড়াজাত পণ্য (উচ্চমানের জুতা, ওয়ালেট, পার্স), প্রক্রিয়াজাত খাদ্য (যা বর্তমানে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ ৭০টির বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে), ঐতিহ্যবাহী জামদানি ও মসলিন বস্ত্র এবং শিল্পসম্মত হস্তশিল্প রপ্তানিতে এ খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশেষ অবদান রাখছে।
  • গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি:  দেশের অকৃষি শ্রমশক্তির ৭০%-এর বেশি নিয়োজিত SME খাতে। গ্রামীণ অঞ্চলে যেখানে বড় শিল্পের উপস্থিতি সীমিত, সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তিকে শোষণ করে কর্মসংস্থান তৈরি করছে। এটি সুষম আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।
  • নারীর ক্ষমতায়ন:  বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও হস্তশিল্প খাতে বিপুল সংখ্যক নারী নিয়োজিত থাকায় এ খাত নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
৩. বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের প্রধান সমস্যা ও পরিচালনগত সংকট (Key Economic & Operational Challenges)

বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার যৌথ প্রভাবে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা খাত চারমুখী গভীর অর্থনৈতিক ও পরিচালনগত সংকটের সম্মুখীন হয়েছে:

৩.১. এলসি (LC) জটিলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) সংকট:

বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) মারাত্মক ঘাটতি এবং লেনদেন ভারসাম্যের (Balance of Payments – BOP) চাপের কারণে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কড়াকড়ির কারণে ব্যবসায়ীদের ঋণপত্র (Letter of Credit – LC) খোলা ও নিষ্পত্তি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

  • পরিসংখ্যানিক চিত্র:  তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে সার্বিক এলসি খোলা আগের বছরের তুলনায় ১৪% হ্রাস পেয়েছে। সিমেন্ট খাতের মূল কাঁচামাল ক্লিংকার ও চুনাপাথর আমদানির এলসি ৩৩% কমে ২.৫৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। শিল্প কাঁচামালের এলসি খোলা ২৭% হ্রাস পেয়ে ১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো—নতুন কারখানা গঠন, আধুনিকীকরণ ও পরিবর্ধনের সূচক ‘মূলধনী যন্ত্রপাতি’ (Capital Machinery) আমদানির এলসি খোলা ৬৫% কমে মাত্র ১.২৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা নতুন বিনিয়োগ স্তব্ধ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
  • ব্যাংকিং কড়াকড়ি ও মার্জিন চাপ:  বাণিজ্য ব্যাংকে উদ্যোক্তাদের পূর্ব নির্ধারিত ঋণসীমা (Credit Limit) শেষ হয়ে যাওয়া এবং নতুন এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ১০০% ক্যাশ মার্জিন (Cash Margin) জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করার কারণে পর্যাপ্ত নগদের অভাবে ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না।
  • কেস স্টাডি (এলপিজি খাতের তীব্র সরবরাহ সংকট):  ডলার ও ব্যাংকিং ঋণসীমা সংকটের কারণে দেশের শীর্ষ ৭টি প্রধান এলপিজি (LPG) আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান (যেমন: বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওরিয়ন, গ্রিনটাউন, ইউনিটেক্স, জেএমআই এবং ইউনিভার্সাল) গ্যাস আমদানি পুরোপুরি বন্ধ বা আশঙ্কাজনকভাবে কমাতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিইআরসি (BERC) ডেটা অনুযায়ী, ইউনিটেক্স ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১.৫৫ লাখ টন এলপিজি আমদানি করলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা শূন্যে নেমে আসে। বসুন্ধরা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১.৩৮ লাখ টন আমদানি করলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে মাত্র ১০,০২৭ টনে। একইভাবে জেএমআই-এর নম্বর ৫০,০০০ টন থেকে নেমে মাত্র ৮,৮০০ টনে ঠেকেছে। এর ফলে সারাদেশে প্রায় ২ কোটিরও বেশি খালি এলপিজি সিলিন্ডার ডিস্ট্রিবিউটর ও গ্রাহকদের কাছে অলস (Idle) পড়ে রয়েছে। বাজারে এই কৃত্রিম সংকটের মূল কারণ হলো  ব্র্যান্ড-নির্দিষ্ট সিলিন্ডার ব্যবহারের আইনি ও পরিচালনগত বাধ্যবাধকতা ; অর্থাৎ যে কোম্পানিগুলো বর্তমানে গ্যাস আমদানি বাড়িয়েছে, তারা আইনি বা পরিচালনগত কারণে অন্য প্রতিযোগী ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার রিফিল করতে পারে না। ফলে বিশাল সিলিন্ডার সম্পদ অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং বাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।
৩.২. কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি (Raw Material & Freight Costs):
  • বিআইডিএস (BIDS)-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এম এনামুল হকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০-৮০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১১৫ ডলারে উন্নীত হয়।
  • তেল ও জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে সার, কীটনাশক, কেমিক্যাল এবং শিল্প কাঁচামালের উৎপাদন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিবহন (Freight Costs) মাশুল বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং যুদ্ধাঞ্চলসংক্রান্ত নৌ-রুটগুলোতে অতিরিক্ত বীমা প্রিমিয়াম যুক্ত হওয়ার ফলে কাঁচামাল আনয়নে উদ্যোক্তাদের পরিচালনগত ব্যয় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়েছে।
৩.৩. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট (Energy & Fuel Crisis):
  • বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে কয়লা ও জ্বালানি আমদানির বকেয়া বিল মেটাতে না পারায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের বড় বিপর্যয় ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, ডলার ঘাটতিতে বকেয়া বিল শোধ করতে না পেরে ২০২৩ সালে পায়রা পাওয়ার প্ল্যান্টের মতো দেশের বৃহত্তম কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
  • কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যন্ত্রপাতির সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার (Capacity Utilization) করা যাচ্ছে না এবং নির্ধারিত সময়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের সময়সূচি অক্ষুণ্ণ রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
৩.৪. মূল্যস্ফীতি, ক্যাশফ্লো এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঘাটতি:
  • গ্রামীণ ঋণগ্রস্ততা ও স্থানীয় চাহিদা হ্রাস:  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও BIDS-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে  গ্রামীণ পরিবারের ৫১% ঋণগ্রস্ত  (যেখানে মেট্রোপলিটন সিটিতে এই হার ৩২% এবং অন্যান্য নগরাঞ্চলে প্রায় ৪০%)। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি (খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২.৫৪% পর্যন্ত উঠেছিল) এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণের উচ্চ চাপের কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। ফলে দেশীয় বাজারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা ধসে পড়েছে।
  • অর্থায়নে বিশাল ঘাটতি ও জামানত সংকট:  বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশের CMSME খাতে বর্তমানে ২.৮ বিলিয়ন ডলারের (যা মোট জিডিপির ১৯%) বিশাল অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ৩৯.২৬% ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
  • উচ্চ সুদ ও জামানত জটিলতা:  প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ঋণ না পেয়ে বাধ্য হয়ে অনেক উদ্যোক্তা মহাজন, স্থানীয় ব্যবসায়ী কিংবা এনজিও/এমএফআই (MFI) থেকে ৩০-৪০% পর্যন্ত অত্যন্ত চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন, যা তাঁদের ব্যবসায়িক মুনাফা ধসে দিচ্ছে। বিশেষ করে জামানতের (Collateral) অভাবে ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন; দেশের প্রায় ৬০% নারী উদ্যোক্তা কেবল পর্যাপ্ত জামানত না দেখাতে পারার কারণে ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হন।
৪. সংকট উত্তরণের কার্যকর কৌশল ও সমাধান (Actionable Strategies & Solutions)

বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় উদ্যোক্তাদের নিজস্ব পরিচলনগত পরিবর্তন এবং সরকারের রূপান্তরমূলক নীতিগত সহায়তা—উভয় স্তরের বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

৪.১. উদ্যোক্তাদের নিজস্ব পরিচালনগত কৌশল (Enterprise-Level Strategies):

১.  ব্যয় সংকোচন ও শক্তি-দক্ষ প্রযুক্তি (Cost Optimization):  পরিচালন ব্যয়ের অপচয় পুরোপুরি রোধ করতে হবে। কারখানায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করতে শক্তি-দক্ষ (Energy-efficient) যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং অপজাত/বর্জ্য পুনরায় ব্যবহারের (Reuse & Recycling) মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। ২.  স্থানীয় কাঁচামাল ও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ:  আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় বিকল্প উপাদানের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সাথে ঐতিহ্যগত পণ্যের বাইরে বাজারে চাহিদাসম্পন্ন নতুন পণ্য উদ্ভাবন করতে হবে। ই-কমার্স, সোস্যাল মিডিয়া ও সরকারি প্ল্যাটফর্ম (যেমন: EKSHOP)-এর মাধ্যমে পণ্যের ডিজিটাল বিপণন ও সরাসরি বিক্রয় প্রসার ঘটাতে হবে। ৩.  বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতি গ্রহণ (Alternative Financing Mechanisms):  প্রথাগত ব্যাংক ঋণের দীর্ঘসূত্রতা ও জামানত জটিলতা এড়াতে উদ্যোক্তারা নিচে উল্লিখিত আধুনিক বিকল্প আর্থিক হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করতে পারেন:

  • ইনভয়েস ফাইন্যান্সিং (Invoice Financing):  বকেয়া বিল বা আনপেইড ইনভয়েসের বিপরীতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তাত্পক্ষণিক নগদ অর্থ তুলে কার্যকরী মূলধন (Working Capital) সংকট নিরসন করা।
  • সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স (Supply Chain Finance):  বড় করপোরেট খদ্দের বা মূল ক্রেতার সাথে চুক্তির ভিত্তিতে কম সুদে ও সহজে ব্যাংকিং ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
  • অন্যান্য বিকল্প:  ভেন্ডর/সাপ্লায়ার ক্রেডিট, পিয়ার-টু-পিয়ার (P2P Lending) ঋণ এবং ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মূলধন সংগ্রহ।
৪.২. নীতিগত ও সরকারি সহায়তা (Policy & Regulatory Support):

অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুপারিশগুলো নিচে মার্কডাউন সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:

ক্ষেত্র (Area),বিদ্যমান সমস্যা,প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ (Recommended Policy Action)

মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার,ডলারের তীব্র অস্থিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার অবক্ষয়।,ক্রলিং পেগ (Crawling Peg) ব্যবস্থার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে হার স্থিতিশীল করা;  অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসদ্রব্য আমদানিতে  ২৫% ক্যাশ মার্জিন ও ২০% রেগুলেটরি শুল্ক বজায় রেখে জরুরি শিল্প কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কড়াকড়িমুক্ত করা।

বিকল্প মুদ্রা লেনদেন,মোট বাণিজ্যের ৯৯% মার্কিন ডলারে হওয়ায় একক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত ঝুঁকি।,প্রধান দুই বাণিজ্য অংশীদার ভারত ও চীনের সাথে রুপি (INR) ও ইউয়ান (RMB)-এ মাল্টি-কারেন্সি ইনভয়েসিং এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে কারেন্সি সোয়াপ (Currency Swap) প্রক্রিয়া দ্রুত সম্প্রসারণ করা।

ঋণ সুবিধা ও জামানত,ঋণ প্রাপ্তিতে জামানতসংক্রান্ত জটিলতা (৬০% নারী বঞ্চিত) ও চড়া সুদের চাপ।,”ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (CGS) আরও জোরদার ও সহজ করা; ক্ষুদ্র, কুটির ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতহীন সহজ শর্তে কম সুদে বিশেষ ঋণ তহবিল বিতরণ করা।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন,”ব্যাঙ্কিং খাতের খেলাপী ঋণ, দুর্বলতা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ।”,বাংলাদেশ ব্যাংক Order ১৯৭২ সংশোধন করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন ডিভিশনের (FID)  দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা ; কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান এবং স্বচ্ছতার সাথে নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

৫. উপসংহার ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা (Conclusion & Way Forward)

ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের উদ্যোক্তা খাতের জন্য একটি অভূতপূর্ব পরীক্ষা দাঁড় করিয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বড় সংকটই সবসময় মৌলিক সংস্কার ও নতুন রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করে। বর্তমান সংকটকালটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশীয় উপকরণের বিকাশ, প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ এবং স্বনির্ভরতা অর্জনের এক অনন্য অনুঘটক হতে পারে।

এই পরিস্থিতি কাটাতে সাময়িক উপশমের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। অর্জিত প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে সরকারকে অবিলম্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন নীতিগত পরিচালন ক্ষমতা নিশ্চিত করা, বিকল্প মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ত্বরান্বিত করা এবং জামানতহীন ঋণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী কৌশল, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি সুচিন্তিত নীতিগত সহায়তার যৌথ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এই অর্থনৈতিক ঝড় মোকাবিলা করে আরও শক্তিশালী, টেকসই ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি হিসেবে ঘুরে দাঁড়াবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top